বুধবার, ২০ জানুয়ারী ২০২১, ০৯:৪০ অপরাহ্ন

বিজ্ঞপ্তি :

জরুরী সাংবাদিক নিয়োগ চলছে……..রাজশাহীর কথা  অনলাইন পত্রিকায় সংবাদ সংগ্রহ করার জন্য দেশের সকল জেলা-উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হবে।

যশোরে ইউএনও-পিআইওর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ

যশোরে ইউএনও-পিআইওর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ

প্রতীকী ছবি

নিউজ ডেস্ক: যশোরের অভয়নগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) বিরুদ্ধে উপজেলা সহকারী প্রোগ্রামারকে যৌন হয়রানি ও মানসিক নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে।

ভুক্তভোগী নারী কর্মকর্তা প্রতিকার চাওয়ায় তাকে ‘রক্ষা করতে’ বদলির আদেশ দিয়েছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর। অথচ বহাল তবিয়তে রয়েছেন ওই দুই কর্মকর্তা। অভিযোগ রয়েছে, যৌন প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় মানসিক নিপীড়নের পাশাপাশি তাকে হত্যার হুমকিও দেয়া হয়েছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তা।

এদিকে জেলা প্রশাসক বলছেন, বিষয়টি তদন্ত করে সত্যতা পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। অভিযোগের একদিন পরই প্রথম শ্রেণির ওই নারী কর্মকর্তাকে মানিকগঞ্জ শিবালয় উপজেলায় বদলি করা হয়েছে।

অভয়নগর উপজেলার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের সহকারী প্রোগ্রামার ওই নারী কর্মকর্তা গত ২২ ডিসেম্বর অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর কর্মস্থলে যৌন হয়রানি ও জীবননাশের হুমকির অভিযোগ দাখিল করেন। তিনি জানান, গত ৪ মার্চ তিনি অভয়নগর উপজেলায় সহকারী প্রোগ্রামার হিসেবে যোগদান করেন। কর্মস্থলে যোগদানের পর থেকে সততার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু শুরু থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল হুসেইন খান তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ সম্পর্কে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। তাকেসহ অন্য সহকর্মীদের গালিগালাজ করেন যা ভাষায় প্রকাশের অযোগ্য।

এছাড়া অফিসের নির্ধারিত সময়ের পর গভীর রাত পর্যন্ত তাকে অফিসে থাকতে বাধ্য করেন। একপর্যায়ে তিনি প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শরিফ মোহাম্মদ রুবেলের মাধ্যমে কুপ্রস্তাব পাঠান। তাদের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় সর্বশেষ প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে দিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেন। যে কারণে তিনি সম্মান ও আত্মমর্যাদা নিয়ে চাকরি করতে মহাপরিচালকের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে ওই নারী কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রথমে তাদের যৌন লালসার ইঙ্গিত বুঝতে পারতাম না। পরে তারা সরাসরি সঙ্গ দেয়ার প্রস্তাব দেয়। প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ইউএনও স্যারের হয়ে বলতেন আমি কেন স্যারের হতাশা দূর করি না। এই হতাশা অন্য কোনও নারী মেটাতে পারে, স্ত্রী নয়। ইউএনও স্যার আমাকে বলেছেন, প্রশিক্ষণে যাবার সময় প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে আমার সাথে পাঠাবেন। করোনা প্যান্ডামিকের সময় আমি যেন পিআইওর সাথে মোটরসাইকেলে খুলনায় আসা-যাওয়া করি। কারণ আমরা দুজনই খুলনা থেকে অফিস করতে আসতাম। আমি যেতে রাজি হইনি। তাছাড়া আমার মা-বাবা আমাকে নিতে আসতেন। স্যার একদিন বললেন, ওনাদের আসার কেন দরকার? রাতে আপনাকে আকিজে সিট করে দিতে বলি। পিআইও, আমরা সবাই একসাথে না হয় থাকলাম! আমি প্রথম বুঝিনি আকিজ কী। পরে জানতে পেরেছি, আকিজ অফিসের পাশেই একটি সিটি। যেখানে হোটেলসহ অনেক কিছুই আছে। এ ধরনের অনেক নোংরা ইঙ্গিত করা হতো আমাকে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পিআইও সাহেব ঈদের মধ্যে আমাকে অনেককিছু কিনে দিতে চেয়েছেন। সেদিন যখন হতাশা দূর করার কথা বললেন, তখন তাকে বলেছি ভাই একেকজনের হতাশা একেকভাবে দূর হয়। আমিও হতাশ হই। তখন ঘুরে, ছবি তুলে, শপিং করে, সিনেমা দেখে হতাশা কাটাই। তিনি আমাকে তখন বললেন, তাহলে একটা ডিল করা যাক আপনি যখন হতাশ থাকবেন, তখন আমরা আপনার হতাশা কাটাবো। মানে, আমাদের টাকায় ঘুরলাম। শপিং করলাম, সিনেমা দেখলাম। আর আমরা যখন হতাশায় থকবো, তখন আপনি আমাদের একটু সঙ্গ দেবেন। এরপর আমি তার কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাই। কাজের অজুহাতে আমাকে বিকেল পাঁচটার পরও অফিস থাকতে বাধ্য করা হয়। যখন অফিসে অন্য কেউ থাকেন না। গত ২২ ডিসেম্বর বিকেল চারটা ৫২ বাজে আমি গুছিয়ে অফিস থেকে বের হচ্ছিলাম। সেসময় পিআইও সাহেব আমাকে ফোন দিয়ে জানতে চান কোথায় আছি। আমি বলি, অফিসে আছি। কি হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগামীকালের জন্য একটা কাজ আজকেই করতে হবে। পাশে থেকে ইউএনও স্যার বলে দিচ্ছিলেন দুপুর ১২টার মধ্যে লাগবে। এমনিতে আমাকে কাজের নামে অনেক প্রেশার দিয়ে রাখা হতো। আমিতো আমার চাকরি, আমার দপ্তরের কথা ভুলে গিয়েছিলাম। সারাক্ষণ ইউএনও স্যারের কাজে ব্যস্ত রাখা হতো।

ওই নারী কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘সর্বশেষ আমি বললাম, ঠিক আছে আমি কাজটা করবো। কিন্তু আমাকে একটা জনবল দেন। ওটাতো কম্পিউটার অপারেটরের কাজ। তিনি জনবল হিসেবে জয়নাল নামে একজনের কথা বলে। আমি বলি, জয়নালকে অ্যাসিস্ট করবো, যাতে উনি কাজটা করতে পারেন। তাছাড়া আমার ওপর আপনাদের অফিসের অনেক কাজের লোড রয়েছে। তখন পিআইও বলেন, ওকে কাজ দেখালে হবে না। আপনাকেই করতে হবে। আমি জানাই, আমাকে তো ফিল্ডে রাখা হয়েছে। আমি ফিল্ডে থাকি কি না তা তদারকি করা হয়। ৪০ দিনের কর্মসৃজনের কাজে প্রতিদিন মাঠে যেতে হয়। আবার বিকেল চারটার মধ্যে ইউএনও‘কে রিপোর্ট করতে হয়। আমি ফিল্ডে না গেলে আমাকে শোকজ করা হবে। এ কাজ না করলে শোকজ করা হবে। আমি কই যাবো? আমি সেজন্য জনবল চাইলাম। এতে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে মারপিট করে আমাকে ছিঁড়ে ফেলে দেয়ার হুমকি দেন। বলেন, তিনি খুলনার বড় রংবাজ। আমাকে দেখে নেবে। উনি আমাকে এভাবে বলতে পারেন না। আমি একজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা আর পিআইও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা। উনি মূলত ইউএনও স্যারের শেল্টারে এসব বলেন। কিছুক্ষণ পর ইউএনও স্যার পিআইওকে ফোন কেটে দিতে বলেন। এরপর পাঁচটা তিন মিনিটের দিকে ইউএনও স্যারের অফিস থেকে একজন লোক একটা চিঠি নিয়ে এসে বললেন, আপনাকে থাকতে হবে। তখন আমি তালা দিয়ে অফিস থেকে বের হয়েছি। আমার সাথে আমার মা ছিলেন। তিনি বললেন, পাঁচটার পরও থাকতে হবে? তখন ওই লোকটা বললেন, কী করবো, আমরা তো হুকুমের গোলাম। তখন আমি আমার সিনিয়র স্যারদের ফোন করে বিষয়টি জানালাম। বললাম, আজও আমাকে পাঁচটার পরে থাকতে বলা হয়েছে। তখন স্যাররা আমাকে জানান, যেন আমি চলে যাই। এরপর আবার ফোন করে পিআইও আমাকে মারপিট করাসহ প্রাণনাশ এবং অভয়নগরে না ঢোকার জন্যেও হুমকি দেন। একপর্যায়ে প্রাণ ভয়ে পালিয়ে এসেছি। এরপর আর অফিসে যাইনি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সহায়তায় ছুটি নিয়েছি এবং মহাপরিচালক বরাবর অভিযোগ দিয়ে সহায়তা চেয়েছি।

তিনি বলেন, ‘ডিপার্টমেন্ট আমাকে সেফ করার জন্য বদলি করছে। তবে আমি এর বিচার চাই। আমাকে এ বিষয়ে কথা না বলতে ও ফোন বন্ধ রাখতে চাপ দেয়া হচ্ছে। আমি চাপ উপেক্ষা করে ফোন খোলা রেখেছি। দুঃখ হয়, মেয়ের নিরাপত্তা চেয়ে আমার মা-বাবা থানায় জিডি করতে গিয়েছিল কিন্তু পুলিশ তা নেয়নি। আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি এর আগের স্টেশনে ইউএনও স্যারের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ ছিল। আর পিআইও তো তার আগের স্টেশনে ইউএনও’র মাথা ফাটিয়েছিলেন। এজন্য তার দুই বছর বেতনও বন্ধ ছিল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পিআইও শরিফ মোহাম্মদ রুবেল তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি। আমি কোনও কুপ্রস্তাব দিইনি। ওনাকে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করেছেন ইউএনও স্যার। আমি কাজ বুঝে নিতে চাইলে কাজ বুঝিয়ে দিতেন না। অফিস ফাঁকি দিতেন। আমি তাকে ‘বোন’ বলে সম্বোধন করতাম। আমি তাকে কোনও ধরনের বাজে কথা বলিনি। ইউএনও স্যার একজন ভালো মানুষ অথচ উনি (উত্তরা) আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনেছেন। এ কথা শোনার পর আমি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম। আমার স্ত্রী সন্তান আছে। এভাবে উনি আমাদের হেয় না করলেও পারতেন।

জানতে চাইলে ইউএনও নাজমুল হুসেইন খান বলেন, সহকারী প্রোগ্রামার কর্মস্থলে যোগদানের পর থেকে অফিসে সময় দিতেন না। মহান বিজয় দিবসের দায়িত্ব। করোনার দায়িত্ব তিনি পালন করেন না। সর্বশেষ তাকে ৪০ দিনের কর্মসৃজনের কাজে ট্যাগ অফিসার নির্ধারণ করা হয়। এতে তিনি ফাঁকি দিতে পারছিলেন না। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ঘর দেয়ার প্রকল্পের একটি চিঠি দেয়ার শেষ দিন ছিল ২৩ ডিসেম্বর। ২২ ডিসেম্বর পিআইও তাকে ফোন দিয়েছিলেন। তাকে কাজটা করে দিতে সহযোগিতার অনুরোধ করেন। কিন্তু পাঁচটা বাজায় সহকারী প্রোগ্রামার উত্তরা শতদ্রু অফিস ত্যাগ করেন। এনিয়ে তাদের কথা কাটাকাটি হয়েছে। এসময় উভয়ে কিছু আপত্তিকর কথা বলেছে। কিন্তু উত্তরা অডিও এডিট করে অপপ্রচার শুরু করেছে।

তিনি বলেন, কোনও প্রমাণ ছাড়াই আমাকে জড়িয়েও আপত্তিকর অভিযোগ দেয়া হয়েছে। আমার রুমে সিসি ক্যামেরা দেয়া আছে। আমিসহ অফিসে আগত সকলকে দেখা যায় ও সবকিছু রেকর্ড করা হয়। কেউ কখনো বলতে পারবে না, আমি কোনও নারী সহকর্মী বা পুরুষ সহকর্মীর সাথে বাজে ব্যবহার করেছি। আপনারা গোপনে এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন।

ইউএনও আরও বলেন, ছুটি কাটাতে না পারায় তিনি আমাকে জড়িয়ে এসব অভিযোগ করছেন। আমার জানা মতে, পিআইও তাকে কখনো উত্ত্যক্ত করেননি। তারপরও বিষয়টি তদন্ত হোক। তাহলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। এছাড়া এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন আমি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর পাঠিয়েছি।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান বলেন, আমি অভিযোগটি শুনেছি। এটা তদন্ত না করে কিছু বলা যাবে না। তবে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পেলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।সূত্র:আরটিভি নিউজ

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন.......




© All rights reserved © 2020 Rajshahirkotha.Com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com